Saturday, September 1, 2012

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, শেখ মুজিবুর রহমান ও তৈমুর রেজা


গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ একটা রুল জারি করে। রুলটা অবশ্যই বহুল আলোচিত এবং ভাষা নিয়া। ওই দিন প্রথম আলোতে প্রকাশিত সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের একটা লেখার সূত্রে আদালতের এই রুল। মজার ব্যাপার হইলো, আমরা হাইকোর্টের রুলটা নিয়া অনেক কথা কইছি, তর্ক-বিতর্ক করছি। কিন্তু রুল যে লেখাটার সূত্রে সেইটা নিয়া তেমন একটা কথা হয় নাই। অবশ্য, হাইকোর্টের রুলটা মর্মভেদী ছিল। সৈয়দ মনজুরুলের লেখাটা আর বিশেষ পাত্তা পায় নাই। লেখার শিরোনাম ‘ভাষাদূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী’। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুর, এই পরিচয়টা আমরা জানি। এও জানি তিনি একজন কথাসাহিত্যিক। বিদ্যা ও অনুভব এই দুই জিনিসের কমতি তার মধ্যে থাকার কথা না। কিন্তু লেখাটা পইড়া মনে হইছিল, হয় এই দুইটা জিনিশের কমতি পড়ছে তার। নয়তো, বর্ণবাদ ও কর্তৃত্ববাদের ভীমরতির শিকার হয়ে পড়ছেন। সৈয়দ মনজুরের লেখার পরতে পরতে যে কেউ কর্তৃত্ববাদী ও বর্ণবাদী প্রসঙ্গ খুঁজে পাবেন। কিন্তু একটু কষ্ট হবে, কেননা যথেষ্ট সাবধানতা সহকারে, সুকৌশলে তিনি এই বর্ণবাদের বিস্তার তার লেখায় ঘটাইছেন। আমার মতো আম জনতার জন্য তার লেখার শিরোনামটাই কাফি।


দূষণ প্রসঙ্গে সৈয়দ মনজুর ভাষার সঙ্গে নদীর তুলনা করছেন। বড়ই মর্মান্তিক তুলনা। কাব্যরস হিসাবে নিম্নস্তরের। তুলনার মাধ্যমে পরস্পর-বিচ্ছিন্ন দুই বিষয়কে এক কইরা দেওয়ার এই চেষ্টা ক্ষতিকর। এই লেখার পরবর্তী ঘটনায় নিশ্চয়ই সবাই ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন। আমি লেখাটা পইড়া পাশ্ববর্তী একজনরে কইছিলাম, ইনি ভাষাও বুঝেন না, নদীও বুঝেন না। ভদ্রলোক বললেন, কী মনে কইরা এই কথা কইলেন? আমি কইলাম, ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসাবে তার জানার কথা ভাষা কীভাবে গইড়া উঠে। প্রথমত পৃথিবীর কোনো জীবিত ভাষাই অন্য ভাষার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ছাড়া গইড়া উঠে নাই। ফলে, পৃথিবীর সকল ভাষাই মিশ্রিত, সৈয়দ মনজুরের ভাষায় দূষিত। পৃথিবীর কিছু ভাষাকে আকাট পণ্ডিতরা মিশ্রণ থিকা বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেই ভাষা ও পণ্ডিত উভয়ের কোন পক্ষই দুনিয়ায় টিকতে পারেন নাই। বাংলা ভাষা সম্পর্কে যদি বলতে হয়, তবে এই ভাষার খাঁটি শব্দ হাতের রেখায় গুনে ফেলা যাবে। আজকে যে ভাষাটারে আমরা বাংলা বইলা চিনি সেইটা সংস্কৃত, ফারসি, আরবি সহ নানা বিদেশী ও স্বদেশী শব্দের মিশ্রণ। আমার মতে, ভাষা বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান আছে এমন ব্যক্তিও ভাষার মিশ্রণকে দূষণ বলতে পারেন না। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যদি নদী সম্পর্কে কিছুটা জানতেন তবে আরও ভাল হইতো। ভাষার সঙ্গে নদীর কিছুটা মিল পাওয়া যাইতো, উনার কাব্য চর্চা একটা রাস্তা খুঁইজা পাইতো। নদী যেইখানে উৎপন্ন হয়, সেই পর্বতের ক্রোড়ে প্রথমে জলধারাগুলো ক্ষীণ থাকে। একটি স্রোতধারার সঙ্গে আর বহু স্রোতধারা মিইলা নদী হিসেবে নিচে নামতে থাকে। ভাষার সাথে যদি নদীর কিছু মিল থাকে তো এইখানে। একটা ভাষা অন্য ভাষা থেকে নিবেই। কতটা নিতে পারলো, নিয়া কতটা নিজের মতো করতে পারলো সেইখানেই ভাষার শক্তি। নদী সবসময় অন্য নদীর পানিস্রোত আকর্ষণ করে। পদ্মায় যমুনায় মিশ খাইলে কেউ কয় না পানি দূষিত হয়া গেল। তেমনি বাংলায় সংস্কৃত, আরবি-ফারসি, ইংরেজি, পর্তুগিজ, তামিল, হিন্দুস্তানী শব্দ ঢুকলে কেউ বলতে পারে না যে ভাষা দূষিত হয়া গেল। অন্য ভাষার শব্দকে যে দূষণ বললেন সৈয়দ মনজুর সেইখানেই তার বর্ণবাদ, জাত বিদ্বেষ, ভাষা বিদ্বেষ। বাংলা ভাষা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কোনো ব্যক্তি এই বর্ণবিদ্বেষের শিকার হইলেন এইটা খুব দুঃখের কথা।
এই প্রসঙ্গে আদালত যে রুল দিছেন সেইটা বেশ কৌতুহলউদ্দীপক। আদালত বলছে, ‘এই ভাষা বঙ্গবন্ধুর ভাষা, রবীন্দ্রনাথের ভাষা, শরৎচন্দ্রের ভাষা, জীবনানন্দের ভাষা, বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষা, আলাওলের ভাষা, সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষা, শহীদুল্লাহর ভাষা, লালনের ভাষা, হাসন রাজার ভাষা, শাহ আবদুল করিমের ভাষা, জসীমউদ্দীনের ভাষা ও কায়কোবাদের ভাষা। আজ এই ভাষার ওপর অত্যাচার চলছে। আমাদের জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই এটা রোধ করতে হবে। বাংলা আজ কেবল বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার ভাষা নয়; এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ভাষা। যে ভাষার জন্য রফিক, জব্বার শহীদ হয়েছেন, সেই ভাষা দিবস আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।’ খবরের এইটুকু পইড়া আমি নিশ্চিত হইছি, আদালতের ভাষাজ্ঞান সৈয়দ মনজরুল হকের চাইতে বেশি। এমনকি আদালত এই বিষয়ে যাদের কথা শুনতে আগ্রহী তাদের চাইতেও বেশি।
রবীন্দ্রনাথের ভাষা আর শরৎচন্দ্রের ভাষা এক না। মুজতবা আলী আর বঙ্কিমের ভাষাও এক না। এই তালিকায় কিছু রেডিকাল নাম আছে। যেমন লালন, হাসন, আবদুল করীম। এমন নামও আছে যারা কলকাতা -কেন্দ্রিক শান্তিপুরি ভাষার জিম্মাদারদের কাছে হুমকি বইলা বিবেচিত হন- যেমন জসিম উদদীন ও কায়কোবাদ। কবিতার মতো সফট আর্টে বরিশালের ডায়ালেক্ট পুশ করার মতো বিপ্লবি কবি জীবনানন্দও আছেন। অর্থাৎ আদালত বাংলাভাষাকে একটা এককাট্টা, একরূপ ভাষা হিসেবে দেখে নাই। ফলে, আদালতের রুলের মধ্যেই ভাষা প্রশ্নের সমাধান আছে। বস্তুত এমন উপাদানও আছে যাতে করে বুঝা যায় আদালতের রুল ভাষার বিপ্লবী বিবর্তনকে সমর্থন দিতে আগ্রহী। অনলাইন ম্যাগাজিন সাময়িকীতে।  তৈমুর রেজার একটা লেখা পড়তেছিলাম। এই লেখায় তৈমুর এই তালিকা সম্পর্কে তার আপত্তি জানাইছেন- 'প্রথমেই মনে আসছে বাংলা ভাষার মালিকানার সওয়াল। এই ভাষাটি কাদের ভাষা? সবার আগে, এই ভাষার মালিক হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। যদিও এই দীর্ঘ তালিকায় তিনিই সবচেয়ে উটকো ব্যক্তি। তার কারণ, এই তালিকাটি একদম নির্জলাভাবেই একটি সাহিত্যিক তালিকা। এখানে বাংলা ভাষার মালিক হিসাবে যাদের নাম আসছে তাঁরা সকলেই সাহিত্যিক, একা বঙ্গবন্ধু বাদে।' পরে লিখছেন, 'কিন্তু আদালতের রায়ে ‘চাষাভুষা’, ‘মুটেমজুর’ এরা কোথায়? এরা নাই তো! এই ভাষা বঙ্গবন্ধুর, রবীন্দ্রনাথের, আলাওলের; কিন্তু এই ভাষা কি চাষাভুষার নয়?'
আদালতের রুলের কোথাও বাংলা ভাষার মালিকানা শেখ মুজিবকে দেওয়া হয় নাই। শেখ মুজিব এই তালিকায় উটকো ব্যক্তি হইতে যাবেন কেন? তিনি তো এই দেশের চাষা-মজুরদের বৈধ প্রতিনিধি আছিলেন। তাদের কথাকে ভাষা দিছিলেন। তার উল্লেখ করা যাবে না কেন? তালিকাটা লেখকদেরই হইতে হবে কেন? এই ভাষা যেমন রবীন্দ্রনাথের ভাষা সেইভাবে তো শেখ মুজিবেরও ভাষা। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দল আছে, পক্ষ-বিপক্ষ আছে। তাই বইলা তাকে আমি উটকো বলবো? এই তালিকায় উল্লেখিত কার পক্ষ-বিপক্ষ নাই? আমাদের মতে, শেখ মুজিবের উল্লেখকে বানচালের যে চেষ্টা করছেন তার মধ্যে একটা সাহিত্যিক বর্ণবাদ আছে। তার লেখায় মুজুরদের উল্লেখ স্রেফ একটা ভাওতাবাজি সে কারণে। একটু চিন্তা করলে তৈমুর বুঝতেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভাষা বিষয়ে যে নতুন তৎপরতা শুরু হইছে তাতে শেখ মুজিব রেডিকেল ব্যক্তি হিসাবে গণ্য হইতে পারেন। কেন রেডিকেল ব্যক্তি সেটা আগামীকাল কান খাড়া রাখলে বুঝা যাবে। আগামী কাল ৭ মার্চ। এখানে আমি  ৭ মার্চের বক্তৃতাটার লিঙ্ক দিলাম।
আওয়ামী লীগের উচ্ছিষ্টভোগী কোন সাহিত্যিক বা অধ্যাপকের সাধ্য আছে এই বক্তৃতাটাকে শুদ্ধ করে দেয়ার?

by Mahbub Morshed on Tuesday, March 6, 2012 at 5:47pm 

No comments:

Post a Comment