Saturday, September 1, 2012

মানী লোকের মান রক্ষায় ব্রাত্য রাইসুর আন্দোলন


২৩ মার্চ প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত আবদুশ শাকুরের 'মুক্তির গান' প্রবন্ধটার কিছু ভাষ্য আমার কাছে গুরুতর আপত্তিকর মনে হওয়ার ফেসবুকে আমি স্টেটাস দিয়া প্রতিবাদ করছিলাম। স্টেটাসটা নিম্নরূপ :
"আজকের প্রথম আলোতে আবদুশ শাকুরের লেখা পইড়া মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। ভদ্রলোক লিখছেন, "বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নিরস্ত্র বাঙালির প্রধান অস্ত্র ছিল সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতির প্রধান অংশ ছিল ভাষা, যার মুখ্য অঙ্গ ছিল গান—বাঙালির মুক্তির গান।" এইটা কী? এই কথা কি রূপক হিসাবে বলা হইলো? এইসব অদ্ভূত বুদ্ধিজীবীর মতে, মুক্তিযোদ্ধারা গান গেয়ে গেয়ে দেশ স্বাধীন করছে। কয়দিন পর হয়তো এনারা লেখা শুরু করবেন, গানের মধ্যে দোয়াদরুদ, তন্ত্র-মন্ত্র দেওয়া থাকতো। পাকিস্তানীরা ওই গানেই কুপোকাত হয়ে গেছে। নয়মাস ধরে গান গাওয়ার পর দেশ স্বাধীন হইছে।'

স্টেটাসের প্রতিক্রিয়ায় অনেকেই আমার মন্তব্যের সঙ্গে আংশিক বা পূর্ণ সহমত প্রকাশ করছিলেন। যারা আংশিক সহমত ব্যক্ত করছিলেন তাদের মনে হইছিল দোয়া-দরুদ, তন্ত্রমন্ত্রের কথা আমি নাও বলতে পারতাম। মুক্তিযোদ্ধারা যে প্রধানত গান গেয়ে দেশ স্বাধীন করে নাই, অস্ত্র নিয়াই যুদ্ধ করছে এইটা বলাই যথেষ্ট ছিল। সঙ্গে হয়তো আমিও এও বলতে পারতাম যে, গানের অবদান তখন ছিল- সেইটা ছিল অনুপ্রেরণার। স্বাধীনতাসংগ্রামে বাঙালি নিরস্ত্র আছিল না, যারা নিরস্ত্র আছিল মানে সশস্ত্র যুদ্ধে যায় নাই তাদের প্রধান অস্ত্র গান হইলে আমার আপত্তি নাই। তবে সংগ্রামে যারা হাজির ছিল, ইতিহাস বলে তারা সশস্ত্রই আছিল। ফলে আবদুশ শাকুরের প্রধান প্রস্তাবনাটিই
অদ্ভূত- অগ্রহণযোগ্য। অবশ্যই এই অদ্ভূত মত আবদুশ শাকুরের একার না। আবদুশ শাকুর একটা মতের প্রতিনিধি যারা মনে করে- সংস্কৃতিবান মধ্যবিত্তের স্নায়বিক সাংস্কৃতিক সংগ্রামের কারণেই মুক্তিযুদ্ধে সাফল্য আসছে, সশস্ত্র যোদ্ধাদের অবদান সেখানে সামান্য।

এই বিষয়ে ব্রাত্য রাইসুর বিচার দেখেন :
Bratya Raisu ‎"বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নিরস্ত্র বাঙালির প্রধান অস্ত্র ছিল সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতির প্রধান অংশ ছিল ভাষা, যার মুখ্য অঙ্গ ছিল গান—বাঙালির মুক্তির গান।" এই কথা ‘প্রথম আলো’তে বলছেন আবদুশ শাকুর। নয়মাস যারা অস্ত্রসহ যুদ্ধ করছেন তাদের অস্ত্র ছিল গান তা তো তিনি আদৌ বলেন নাই।

যারা মনে করেন নিরস্ত্র বাঙালির জন্য গান কোনো বিশেষ ব্যাপার ছিল না তারা তেমন বলতেই পারেন। কিন্তু জাস্ট এই কথা বলার জন্য আবদুশ শাকুরের প্রতি এই ভাষায় আক্রমণ ভীতিকর।
Saturday at 12:58am · Like · 6

(খেয়াল করেন, ব্রাত্য রাইসু 'স্বাধীনতাসংগ্রামে' কথাটা এড়ায়ে গেছেন। সংগ্রামে বাঙালি নিরস্ত্র, ঠিক নিরস্ত্র না পুরাপুরি তার আছে সংস্কৃতি> যে সংস্কৃতির প্রধান অংশ ভাষা> ভাষার আবার মুখ্য অঙ্গ গান। বস্তুত, সংস্কৃতি, ভাষা ও গানের পরস্পর সম্পর্ক নিয়ে এমন একটি অদ্ভূত ভাষ্যের কারণেই আবদুশ শাকুরকে অদ্ভূত বুদ্ধিজীবী বলছি আমি। অদ্ভূত বুদ্ধিজীবী কথাটা তো আক্রমণই। তবে আমার মতে, আক্রমণটা অনেক মৃদু- সাহিত্যিক। সংস্কৃতিকে বৃহত্তর পরিসর থেকে এইভাবে গান পর্যন্ত ঠেকানোর জন্য অদ্ভূত যুক্তিশৃংখলা তৈয়ার করছেন আবদুশ শাকুর তাকে অদ্ভূত বুদ্ধিজীবীতা আখ্যায়িত না করলে আর কী নামে ডাকা যায়?)

পরে এক জায়গায় রাইসু বলতেছেন :

Umme Rayhana Mahbub Morshed
‘মুক্তির গান'রে যুদ্ধের চেয়ে মহীয়ান দেখাইতে চায় শরণার্থী শিবিরিয়ানরা। কারণ তাদের হাতেই প্রচারযন্ত্র এখন। আর যারা যুদ্ধ করছেন তারা হয়তো নিজেদের কাজের গুরুত্ব বোঝেন তাই অত সাড়ম্বর হন না। / ব্রারা ২৪.৩.২০১২

আবদুশ শাকুরের পক্ষে অবস্থান নিয়া যে ব্রাত্য রাইসু আমার মতকে খণ্ডন করতে চাইতেছেন তিনি কেমনে এই কথা কন? মন্তব্যে রাইসু মুক্তির গান আর যুদ্ধরে আলাদা কইরা ফেলছেন। এইখানে শরনার্থী শিবিরিয়ানদের কথা আনছেন। প্রকৃতপক্ষে, অফিসিশিয়াল শরনার্থী শিবিরের বাইরে কলকাতা শহরে অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক শিবির গইড়া তুলছিলেন তারাই গানরে যুদ্ধের চাইতে মহীয়ান কইরা দেখাইতে চায়। মজার ব্যাপার এদের হাতেই প্রচারযন্ত্র এখন, এরা গানরে মানে ভাষারে মানে সংস্কৃতিরে মানে সুবিধাবাদী মধ্যবিত্তের সংস্কৃতিরে সামনে আনতেছে যুদ্ধরে পিছনে ঠেইলা। আহমদ ছফা বহু আগে এই ষড়যন্ত্রের গোমর ফাঁস কইরা দিছিলেন। বস্তুত ষড়যন্ত্রটা শ্রেণীগত। যারা যুদ্ধ করছেন তাদের হাতে সংস্কৃতি নাই ফলে রাইসুর পরামর্শ মোতাবেক তারা মহীয়ান নিরবতা পালন করতেছেন নাকি তাদের নিরবতা পালন করতে বাধ্য করা হইতেছে। মুক্তির গান নিয়া যে স্পন্সরড বাণিজ্য হইতেছে তাতে যুদ্ধের রক্তপাত, ঘাম, পুঁজের স্থান কোথায়? প্রশ্নটা শ্রেণীগত এবং গুরুতর। সে আলোচনায় একটু পরে আসি। ব্রাত্য রাইসুর কাছে প্রশ্ন, আবদুশ শাকুর কি শরণার্থী শিবিরিয়ান? আবদুশ শাকুর ১৯৭১ সালে বান্দরবানের এসডিও আছিলেন। আমরা পাকিস্তনে আটকা পড়া বাংলাদেশীদের কথা জানি, বাংলাদেশে আটকা পড়া পাকিস্তানীদের কথাও জানি। কিন্তু বান্দরবানে আটকা পড়া মহকুমা শাসকের কথা প্রথম জানলাম। এর মানে কী? পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারণে তিনি কি তাদের হাতে বন্দি হইছিলেন। নাকি অস্ত্রের মুখে দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হইছিলেন? আবদুশ শাকুর কবে শরণার্থী শিবিরিয়ান হইলেন? ১৯৭১ সালে আবদুশ শাকুর কী করছেন সে প্রশ্ন তোলার অধিকার আমার নাই। আমি বরং ব্রাত্য রাইসুর অবস্থান জানতে আগ্রহী। যিনি মুক্তির গান আর যুদ্ধের পার্থক্য করতে পারেন। শরণার্থী শিবিরিয়ান ফেনোমেনা উল্লেখ করতে পারেন। প্রচারযন্ত্রের ভূমিকা বুঝেন তিনি, আবদুশ শাকুর সাহেবদের মতবাদের মধ্যে শ্রেণী ও বগীয় রাজনীতি বুঝতে পারতেছেন না এইটা মানতে আমি রাজি না। এই রাজনীতির ভীতিকর চেহারাটা না দেইখা আমার প্রতিবাদকে ভীতিকর আখ্যা দেওয়া ব্রাত্য রাইসুর কেমন রাজনীতি হইতে পারে?
মজা আরও আছে, আমার মন্তব্যকে ভীতিকর বলায় ব্রাত্য রাইসুর প্রতি সুমন রহমান কমেন্ট করেছেন :

Sumon Rahman ‎"কিন্তু জাস্ট এই কথা বলার জন্য আবদুশ শাকুরের প্রতি এই ভাষায় আক্রমণ ভীতিকর।" Bratya Raisu

-- ভয়টা ঠিক কিসের বুঝলাম না। পরিষ্কার করলে আমরাও ভয় পাইতে চেষ্টা করতে পারি।
Saturday at 11:22am · Like · 1

সত্যি কথা বলতে ভয়টা কীয়ের সেইটা জানার আগ্রহ আমারও আছিল। তো ব্রাত্য রাইসুর উত্তর দেখেন :

Bratya Raisu শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিরে বিনা কারণে অশ্রদ্ধা করতেছে সেইসব চোটপাট-বুদ্ধিজীবীরা--এমন দৃশ্য পোড়া চউখে দেইখা ফেলানোর ভয়, ডিয়ার Sumon Rahman. কিন্তু আপনি যা চেষ্টা করবেন তা কি আর আপনার লগের অন্যেরা বুঝতে পারবে? মনে হয় না।Sunday at 11:18am · Like

কারণ তো রাইসুর কমেন্ট উদ্ধার কইরা আগে কইলাম। এখন দেখেন উনি কেমন ভণ্ডামীটা করতেছেন 'বিনা কারণে' বইলা? শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিরে বিনা কারণে অশ্রদ্ধার পোড়া দৃশ্য দেইখা ফেলানোর ভয় পাইছেন উনি। ভণ্ডামী যদি না বলি তাইলে বলতে হয়, রাইসু মজা নিতেছেন।আমি ব্রাত্য রাইসুর এই কমেন্ট দেখি নাই। পরে সুমন রহমানের কমেন্ট দেখছি। সুমন রহমান, ব্রাত্য রাইসু ও আমার কমেন্ট পর পর তুইলা দিলাম

Sumon Rahman আপনার স্নেহধন্য "চোটপাট বুদ্ধিজীবী" এইখানে যেটুকু "অশ্রদ্ধা" করতেছে তার পক্ষে ন্যুনতম হইলেও একখানা কারণ সে দাখিল করছে (সেটা আপনার কাছে "অশ্রদ্ধা" করার জন্য অপ্রতুল বোধ হইতে পারে)। কারণ দাখিল না করিয়া, এমনকি অন্যের মুখে ঝাল খাইয়াও "অশ্রদ্ধা" অবজ্ঞা করার বাতিক এই "চোটপাট বুদ্ধিজীবী"দের আছে, এবং নিকট অতীতের সেইসব মোক্ষম মুহূর্তের কোনো কোনোটায় আপনি যেসব সোনালি ভূমিকা রাখছেন সেগুলো খেয়ালে রাখলে আপনের বর্তমান উক্তি কিঞ্চিৎ ভীতি উৎপাদন করে বৈকি! আশা করি আমার লগের অন্যরাও সেই ভয়ের আবেশ থেকে বঞ্চিত হবে না।
  • Sunday at 12:52pm · Like · 1
Bratya Raisu করবে না। মানী লোকের মান নিয়া কথা হইতেছে।
Sunday at 12:55pm · Like · 1

Mahbub Morshed সুমন ভাই, চোটপাট বুদ্ধিজীবী শব্দবন্ধ মনে ধরলো। চোটপাট বুদ্ধিজীবীর উল্টা শব্দবন্ধ হইতে পারে চোট খাওয়া বুদ্ধিজীবী। দেখেন, হইলো কি না।
সত্যি কথা বলতে, আমার অতীত কৃতকর্মের দায় ব্রাত্য রাইসুর কিছুতেই নয়। আমি স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে বুদ্ধিজীবীতা করি। এইখানে কাউরে টানা ঠিক না।
তবে ব্রাত্য রাইসু এইবার যে মানী লোকের মান রক্ষার সংগ্রামে নামছেন তাতে আমি একটু চিন্তিত। যাউক, অধিক চিন্তা কইরা ফায়দা কী?
13 hours ago · Like · 1

Sumon Rahman মাহবুব মোর্শেদ, "চোটপাট বুদ্ধিজীবী" ব্রাত্য রাইসুর টার্ম আপনার ব্যাপারে। প্রশংসা তার প্রাপ্য। আপনার "বুদ্ধিজীবিতা" বিষয়ে আমি অন্য শব্দবন্ধ ব্যবহারের পক্ষপাতী, একান্ত নিরুপায় হইলে। আর নিরুপায় না হইলে মনোযোগ না-দেয়ার পক্ষপাতী।
10 hours ago · Like · 1

Mahbub Morshed সুমন ভাই,
ভেরি স্যরি। ব্রাত্য রাইসুর এই মন্তব্যটা চোখ এড়ায়ে গেছিল। আমি ভাবছিলাম আপনে দিছেন। ব্রাত্য রাইসু অতোটা পঁইচা গেছেন বইলা আমার মনে হয় নাই। এখন দেখতেছি, ব্রাত্য রাইসু পুরা পঁইচা গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা নিয়া সুবিধাবাদী মধ্যশ্রেণীর মিথ্যা দাবিদাওয়ার প্রশ্নরে তার 'বিনা কারণ' মনে হইতেছে। আবদুশ শাকুরের মান রক্ষার জন্য ব্রাত্য রাইসুর এই সর্বাত্মক সংগ্রাম বেশ টার্নিং পয়েন্ট। about an hour ago · Like

সত্যি কথা বলতে ব্রাত্য রাইসু সত্যিই পঁইচা গেছেন। মানী লোকের মান রক্ষার কার্যক্রমে তিনি যে তৎপরতা দেখাইছেন সেইটা মজার। একাধিক স্টেটাস, নোট, নানা জায়গায় ছড়ানো কমেন্ট দিয়া রীতিমতো একটা বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড বাঁধায়ে দিছেন। সকল যুক্তি, তর্ক, রাজনৈতিক অবস্থান, বুদ্ধিবৃত্তি তুইলা রাইখা মানী লোকের মান রক্ষার এ আন্দোলন কেন করছেন ব্রাত্য রাইসু?

ফুটনোট : আবদুশ শাকুরের লেখায় আরও বহু উপাদান আছে যেইগুলার দিকে পাঠকের দৃষ্টি টানা উচিত। বঙ্গভঙ্গ, ৫২, ৭১ প্রসঙ্গগুলা একটু খেয়াল কইরা পড়লেই হবে। সেসব নিয়া পরে কখনো আলাপ করা যায়।
by Mahbub Morshed on Tuesday, March 27, 2012 at 3:41pm

No comments:

Post a Comment